ব্যবসায়িক পার্টনারশিপের নামে কোটি টাকার প্রতারণা: জুলাই বিপ্লবের আবেগ পুঁজি করে শাহীন এর নতুন ফাঁদ!

প্রতারক শাহীন

বিভিন্ন আকর্ষণীয় ও লোভনীয় ব্যবসার কথা বলে এবং দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ‘জুলাই বিপ্লবের’ আবেগ ও নাম ভাঙিয়ে শতশত মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর প্রতারণামূলক চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে মোহাম্মদ আলী নাজির শাহীন (Mohammad Ali Nazir Shaheen) নামের এক ব্যক্তির নাম। নিজেকে একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দাবি করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সুকৌশলে এই অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মহাখালী ডিওএইচএস (DOHS)-এ রাজকীয় অফিস খুলে বসা এই প্রতারক সম্প্রতি তাঁর প্রধান কার্যালয়টি গুটিয়ে নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন। তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আত্মগোপনে থেকেই তিনি এখনো নতুন নতুন মানুষের সাথে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ মিলেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, চক্রের মূল হোতা শাহীন জুলাই আন্দোলনের শহীদদের এবং সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠেছেন। আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক শহীদ মীর মুগ্ধর নাম ব্যবহার করে একটি বইয়ের প্রকাশনীও বের করেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে, বিপ্লবের স্পিরিট ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে এই প্রকাশনীর আড়ালে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক চাঁদাবাজি এবং বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তিনি। আন্দোলনের সাথে যুক্ত একদল সরলমনা তরুণ ও শুভাকাঙ্ক্ষীকে নিঃস্ব করার পেছনেও এই ব্যক্তির হাত রয়েছে বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী সুলাইমান তপু’র করুণ কাহিনী

এই চক্রের অন্যতম শিকার হয়েছেন সুলাইমান তপু (Sulaiman Topu) নামের এক বালক। তিনি আমাদের অনুসন্ধান দলের কাছে উপস্থিত হয়ে প্রতারক শাহীনের বিরুদ্ধে যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ ও জালিয়াতির নথি তুলে ধরেন।

সুলাইমান তপু জানান, শাহীন প্রথমে অত্যন্ত সুকৌশলে তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন এবং গভীর বিশ্বাস অর্জন করেন। এরপর চীন (China) থেকে পণ্য ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট (আমদানি-রপ্তানি) করার লাভজনক ব্যবসার প্রস্তাব দেন। সরল বিশ্বাসে তপু তাঁর সাথে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বে জড়ান। এই ব্যবসার কথা বলে সুলাইমান তপুর কাছ থেকে দফায় দফায় মোট ৮ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেন শাহীন।

এর মধ্যে মালামাল কেনা বাবদ দুটি চেকের মাধ্যমে ৬ লক্ষ ৬৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়। আর বাকি ১ লক্ষ ৩৪ হাজার টাকা বিদেশ থেকে পণ্য ছাড়ানোর আনুষঙ্গিক খরচের কথা বলে নগদ হাতিয়ে নেওয়া হয়।

প্রমাণ হিসেবে দেওয়া হলো ‘ভুয়া ও শূন্য অ্যাকাউন্টের’ চেক

ভুয়া ও শূন্য অ্যাকাউন্টের চেক
ভুয়া ও শূন্য অ্যাকাউন্টের চেক

ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লেনদেনের বিপরীতে শাহীনের মালিকানাধীন বা পরিচালিত ‘পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম লিমিটেড’ (PENINSULA CONSORTIUM LTD)-এর প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি, পল্লবী শাখার (অ্যাকাউন্ট নং: ০১৮৬১MXXXXXXXXX) দুটি চেক সুলাইমান তপুকে দেওয়া হয়। যার একটিতে ৩ লক্ষ ৬৬ হাজার টাকা (চেক নং: CDB 7575371, তারিখ: ০৩/০৩/২০২৬) এবং অন্যটিতে ৩ লক্ষ টাকা (চেক নং: CDB 7575370, তারিখ: ০৩/০৩/২০২৬) উল্লেখ রয়েছে। চেকে সিইও হিসেবে মোহাম্মদ আলী নাজির শাহীন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে এস. এ. এম. আরিয়ান নাজিরের স্বাক্ষর ও সিল রয়েছে।

তবে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী যখন এই চেক দুটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে নগদায়নের জন্য জমা দেন, তখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায় যে ওই অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই (Fund Insufficient)। অর্থাৎ, পূর্বপরিকল্পিতভাবে টাকা আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই এই ভুয়া ও শূন্য অ্যাকাউন্টের চেক দিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে।

অনুসন্ধানী দলের হাতে আসা প্রতারক শাহীনের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অনুযায়ী, তার পুরো নাম মোহাম্মদ আলী নাজির শাহীন। পিতা: মৃত আব্দুল মজিদ, মাতা: শাহেদা বেগম। জন্মতারিখ: ৩১ অক্টোবর ১৯৭০ এবং এনআইডি নম্বর: ১৫৯৫৭০৮৯MXXXX।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুলাইমান তপু মাত্র একজন প্রতিনিধি। শাহীনের এই জালিয়াতির শিকার হয়েছেন দেশের আরও শতশত মানুষ। কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে মহাখালী ডিওএইচএসের অফিস বন্ধ করে পালিয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে ভুক্তভোগীরা তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন।

এই সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে এবং জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারে ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং আইনি ব্যবস্থার জোর দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *